সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আলীকদম (বান্দরবান):
‎পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির জলধারা, চারপাশে ঘন সবুজ বন, খাড়া পাহাড় আর বিশাল পাথরের সারি। কোথাও ঝিরির কলতান,কোথাও পাহাড়ের নিস্তব্ধতা।দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে প্রকৃতির এমন রূপের দেখা মেলে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সাইংপ্রা ঝর্ণায়। পর্যটকদের কাছে তুলনামূলক কম পরিচিত এই ঝর্ণা যেন পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক পাহাড়ের লুকায়িত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তবে এর রূপ উপভোগ করতে হলে শুধু প্রকৃতিপ্রেমী হলেই চলে না,প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা,পর্যাপ্ত প্রস্তুুতি ও দুর্গম পাহাড়ী পথে চলার মানসিকতা।
‎
‎বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পূর্ব দিগন্তে চিম্বুক রেঞ্জের কির্সতং পাহাড়ের কাছাকাছি সাইংপ্রা ঝর্ণার অবস্থান। প্রচলিত পর্যটন কেন্দ্রের মতো এখানে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পাহাড়ি ট্রেইল,খাড়া ঢাল ও বড় বড় পাথর পেরিয়ে যেতে হয় ঝর্ণাটির কাছে। চার থেকে পাঁচটি ধাপে নেমে আসা ঝর্ণাটির প্রতিটি স্তরেই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়া পানির শব্দ আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ।
‎
‎দুর্গম পথেই অভিযানের রোমাঞ্চঃ- সাইংপ্রা ঝর্ণায় যাওয়ার অন্যতম পথ হলো কির্সতং ও রংরাং পাহাড় অভিযান শেষে খেমচং পাড়া হয়ে যাওয়া। মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং পাহাড় সামিটের পরিকল্পনার সঙ্গে ঝর্ণাটিকে যুক্ত করলে বাড়তি একটি দিন হাতে রাখা যেতে পারে। তবে পুরো পথের দুর্গমতা বিবেচনায় ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। খেমচং পাড়া থেকে সাইংপ্রা ঝর্ণার ট্রেকিং শুরু হয়। প্রথমেই খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হয়। এরপর সামনে পড়ে বড় বড় বোল্ডারে ভরা পিচ্ছিল পাথুরে পথ।কোথাও পাথর আঁকড়ে এগোতে হয়, কোথাও পা ফেলার জায়গা খুঁজে নিতে হয় সতর্কভাবে। বর্ষা কিংবা বৃষ্টির পর এই পথ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‎
‎পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামার পর একপর্যায়ে শুরু হয় ওপরে ওঠার পালা। পাথুরে পথ ধরে দীর্ঘক্ষণ এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা মেলে সাইংপ্রা ঝর্ণার। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে চোখের সামনে ঝর্ণার জলধারা ভেসে ওঠার মুহূর্তটি অভিযাত্রীদের কাছে হয়ে ওঠে বিশেষ প্রাপ্তি। এই যাত্রায় শুধু ঝর্ণা দেখাই নয়,কুয়াশায় ডাকা পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর দুর্গম পরিবেশকে কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগও রয়েছে। ঘন বন,পাথুরে পথ ও নির্জন পাহাড়ি জনপদ মিলিয়ে পুরো ট্রেকিং হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
‎
‎কীভাবে যাবেন সাইংপ্রা ঝর্ণায়ঃ- ঢাকা থেকে সাইংপ্রা ঝর্ণায় যেতে প্রথমে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় পৌঁছাতে হবে। সরাসরি আলীকদমগামী বাস পাওয়া গেলে যাত্রা সহজ হয়। সরাসরি বাস না পেলে কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে চকরিয়া নেমে সেখান থেকে আলীকদম যেতে পারেন।
‎
‎আলীকদম পৌঁছে পানবাজার এলাকা থেকে স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এরপর মোটরসাইকেল অথবা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত চান্দের গাড়িতে করে ১৩ কিলো এলাকায় যেতে হয়। সেখান থেকে দুসরী বাজার হয়ে ট্রেকিং করে মেনকিউ পাড়া ও মেনিয়াংক পাড়ার দিকে এগোতে হয়।
‎
‎ভ্রমণপথের বিভিন্ন অংশে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত স্থানের নাম ও যাতায়াতের ব্যবস্থা সম্পর্কে আগেই নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সড়ক ও পরিবহন পরিস্থিতি অনুযায়ী যাত্রার সময় এবং ব্যয়ও পরিবর্তিত হতে পারে।
‎
‎মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং পাহাড় অভিযানের পর খেমচং পাড়া হয়ে সাইংপ্রা ঝর্ণার পথে যাওয়া যায়। দুর্গম ট্রেইল এবং যাতায়াতের সময় বিবেচনায় খুব সকালে যাত্রা শুরু করা প্রয়োজন। একই দিনে ঝর্ণা দেখে নিরাপদে ফিরে আসা সম্ভব কি না, তা আবহাওয়া, দলের সক্ষমতা ও স্থানীয় গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
‎
‎আদিবাসী পাড়ায় রাতযাপনের সুযোগঃ- সাইংপ্রা ঝর্ণার আশপাশে পর্যটকদের জন্য প্রচলিত হোটেল বা রিসোর্টের ব্যবস্থা সীমিত। ফলে ভ্রমণকারীদের রাতযাপনের জন্য স্থানীয় আদিবাসী পাড়ার মানুষের সহযোগিতা নিতে হয়। মেনিয়াংক পাড়াসহ সংশ্লিষ্ট পাড়ায় থাকার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই পাড়ার কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। স্থানীয় মানুষের বাড়িতে অতিথি হিসেবে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পাড়ার মানুষের সম্মতি,স্থানীয় রীতিনীতি ও সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। খাবারের ব্যবস্থাও আগে থেকে আলোচনা করে নেওয়া উচিত। এসব দুর্গম এলাকায় খাবারের দোকান ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সহজে পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং জরুরি সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে হবে।
‎
‎দূর্গম পাহাড়ে অভিযানের প্রস্তুতিতে যা প্রয়োজনঃ-
‎সাইংপ্রা ঝর্ণার ট্রেকিং সহজ কোনো ভ্রমণ নয়। দীর্ঘ সময় হাঁটা,খাড়া পাহাড়ে ওঠানামা এবং পিচ্ছিল পাথুরে পথ অতিক্রম করার জন্য শারীরিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। সঙ্গে নিতে হবে ভালো মানের ট্রেকিং ব্যাগ, বৃষ্টির পানি থেকে জিনিসপত্র রক্ষার জন্য রেইনকভার,উপযুক্ত ট্রেকিং জুতা,পানির বোতল, শুকনো খাবার, স্যালাইন, গ্লুকোজ, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী এবং হেডল্যাম্প।
‎
‎পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানীয় জল সঙ্গে রাখা জরুরি। পাশাপাশি মশা ও অন্যান্য পোকা মাকড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এলাকাটি ম্যালেরিয়াপ্রবণ হলে ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
‎ক
‎ির্সতং ও রংরাং অভিযানের পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলে স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পথ হারানো, পাথরে পিছলে পড়ে যাওয়া কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দলের সদস্যদের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজন হলে অভিযান সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
‎
‎পর্যটনের সম্ভাবনা,সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ:
‎প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের কারণে সাইংপ্রা ঝর্ণা ভবিষ্যতে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। কির্সতং ও রংরাং পাহাড় অভিযানের সঙ্গে ঝর্ণাটি যুক্ত হলে একই ভ্রমণে পাহাড়ের চূড়া, পাথুরে ট্রেইল ও জলধারার সৌন্দর্য উপভোগের সুয